Friday, 25 May 2018

জাপান কাহিনী ৫:"বড্ড বেশি" সেফ!

pc: youtube.com
জাপানের কিছু গল্প আগেও লিখেছি ।
জাপান কাহিনী ৪.
সত্যি বলতে কি, ওখানে থাকাকালীন লেখালেখির  আরেকটু সময় এবং ঝোঁক থাকলে এতদিনে বই লিখে ফেলতে পারতাম।
তখন নানা চাপে [ধরে নেওয়া যাক, মেনলি পড়াশোনা😄], ঠিক সময় করে গুছিয়ে লিখিনি কিছু। এখন মাঝে মাঝে গল্প করতে গিয়ে, স্মৃতির ফাঁক ফোকরে আটকে থাকা কিছু ঘটনা বেরিয়ে আসে.....

স্কলারশিপের পয়সা বেশ ভালো ছিলো। তবে খরচের হাত ও বেশ ভালো ছিলো । তাই ঠিক গুছিয়ে ভবিষতের কথা ভেবে কিছু কেনা হয়ে উঠতো না । এমনি ব্যালান্সড(??) আয়-ব্যায় নিয়ে ভালোই চলছিল ।কিন্তু এক (সত্যি শুভাকাঙ্ক্ষী ) দাদার উপদেশ এলো। ..
' উল্টো পাল্টা এতো খরচ না করে একটা ল্যাপটপ কিনলে পারিস তো ! তোরই কাজে দেবে !'
[সত্যি,বয়স এবং অভিজ্ঞতা দারুন জিনিস, পারফেক্ট উপদেশ। আরে নানা দাদা, তোমাকে বুড়ো বলিনি  😄]
কথাটা মনে ধরলো।
কিছুদিন পয়সা জমিয়ে, শুভ মুহূর্ত দেখে কিনে ফেললাম একটা ল্যাপটপ।
TOSHIBA ! (yess !!!)

বলা বাহুল্য, আজ থেকে ২০ বছর আগে, নিজের পয়সায় একটা ল্যাপটপ কেনার আনন্দ কিন্তু একেবারে অন্যরকম ছিল , আকাশ ছোঁয়া!

তার দুটো কারণ:
১. কোনোদিন ভাবিনি student অবস্থায় নিজের পয়সায় একটা জলজ্যান্ত কম্পিউটার কিনতে পারবো ।
২. জাপান যাবার আগে কম্পিউটার নামক জিনিসটাতে কোনোদিন হাতই  দিই  নি, নিজের হাতে পাওয়া তো দূরের কথা ।
[মনে পড়ে, বেনারসে যখন M.Sc করছি, তখন আমার ইউনিভার্সিটি প্রফেসর একটা কম্পিউটার কিনেছিলেন। আমাদের ১০ জন student কে শীততাপনিয়ন্ত্রিত ঘরে রাখা বাক্সটার দিকে দেখিয়ে বলেছিলেন, "ওই যে কম্পিউটার, সাবধান, জুতো খুলে রুমে ঢুকবে, হাত দেবেনা "] 

.......তাই সব মিলিয়ে একটা দারুন অনুভূতি! গর্ব, আনন্দ, shock ....সব মিলে মিশে একাকার।

ল্যাপটপ এর ব্যাগ হয়ে উঠলো আমার দিবারাত্রের সঙ্গী । মেশিনটা সারাক্ষন আমার কাঁধে কিংবা হাতে কিংবা টেবিলে,...সব সময় চোখের সামনে, পারলে ছুঁয়ে থাকা ।অনেকটা ছোটবেলায় পুজোর সময় নতুন Bata-র জুতোর  মতন, বালিশের পাশে রেখে শুতেও  গেছি ।
মনে পড়ে ? ঠিক সেমনি।

যাচ্ছিলাম Kobe থেকে Hiroshima দুদিনের ছুটিতে । পিঠে জামাকাপড়ের ব্যাগ, হাতে ল্যাপটপ এর ব্যাগ । স্টেশনে বসে কফি কাপ হাতে লোকজন দেখছিলাম, ট্রেনের অপেক্ষায় ।
ঘড়ি ধরে ৭:৫৭ এ  ট্রেন এসে দাঁড়ালো । জাপানের হাই স্পিড ট্রেন shinkansen । দেখেই আমি
মুগ্ধ ।যেন রূপকথা। ঝকঝক করছে । অটোমেটিক দরজা খুলে গেলো। ২ মিনিট স্টপ ।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতন উঠে গেলাম ট্রেনে , totally hypnotized ।
[হিন্দি সিনেমায় গ্রাম থেকে বোম্বে শহরে এসে Govinda-র  যেমন মুখটা হয়  ঠিক তেমনি মুখের ভাব ]
গুছিয়ে বসলাম, ট্রেন ছেড়ে দিলো।

Excitement-এর লেভেলটা  বুঝিয়ে বলা মুশকিল। দুর্গাপুরের মতন ছোট শহরে এ বড়  হওয়া নিতান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আমি, জাপানের shinkansen এ বসে, হাতে নিজের কেনা ল্যাপটপ ব্যাগ ঝুলিয়ে Hiroshima বেড়াতে যাচ্ছি   ...ব্যাপারটাই কেমন জানি স্বপ্নের মতন।
সে যাগ্গে, গাড়ি ছুটলো হিরোশিমার দিকে।
জানলার বাইরে হু হা করে মাঠ গাছ  বাড়ি ঘর ছুটে চললো। আমি Shinkansen এর স্পিডে মোহিত হয়ে তাই দেখতে লাগলাম ।

হঠাৎ......
আমার ল্যাপটপ ব্যাগ ?
পাশে রাখা শুধু জামাকাপড়ের ব্যাগ ....
এদিক ওদিক তাকালাম । ব্যাপারটা বিশ্বাসই হচ্ছে না, ওটা তো সারাক্ষন আমার কাঁধে থাকে !
মাথার ওপরের শেলফ এ দেখলাম।
পায়ের কাছে, সিটের নিচে।
....কোথাও নেই!
বাবা মা সাথে নেই যে বকা খাবার ভয়!
কিন্তু দুঃখে চোখে জল এসে গেলো । বহু কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে কেনা বড্ড প্রিয় একটা জিনিস নিজের গাফিলতিতে হারালাম। চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে জল ।
সামনের জাপানি মহিলা বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন সব ঠিক আছে কিনা ।
কি একটা উত্তর দিলাম মনে নেই...
উনি ওনার পাশের ভদ্রলোকের সাথে জাপানিতে কিছু কথা বলে তারপর আমাকে বললেন, তুমি পরের স্টেশন Himeji তে নেমে যাও , উল্টো দিকের গাড়ি ধরে Kobe  ফিরে যাও , পেয়ে যাবে ।

তখন রাগে দুঃখে মাথায় আগুন জ্বলছে। .."পেয়ে যাবে" শুনে সেই আগুনে যেন ঘি পড়লো।

নেহাত জাপানিটা তখনও পাল্টা জাপানিতে উত্তর দেবার মতন রপ্ত হয়নি, তাই চুপ ছিলাম ।
তবে মনে মনে ওনাকে বাংলায় বললাম  ......
"  ইসসসসস পেয়ে যাবে! তাই কখনো পাওয়া যায়? ৩০ মিনিট Shinkansen  এ চেপে Himeji , নেমে আবার টিকিট কেটে উল্টো দিকের প্লাটফর্ম থেকে Kobe -র গাড়ি।.সব মিলিয়ে দেড় ঘন্টা মিনিমাম !! স্টেশন এ ফেলে আসা ল্যাপটপ পেয়ে যাবো? বললেই হলো? যা খুশি সান্তনা দিলেই হলো? যত্ত সব "

Himeji তে নামলাম ।
টিকিট  কেটে পরের ট্রেনে Kobe । Shinkansen আর নয়, 'পাতি' লোকাল ট্রেন । সারাক্ষন যেখানে যত ঠাকুর এর নাম জানি তাদের ডাকতে ডাকতে চললাম।  দুচারখানা মানসিক ও করেছিলাম হয়তো , মনে নেই!
পেয়ে গেলে ওই দেবো, পেয়ে গেলে তাই করবো। একেবারে মরিয়া!
ধিকধিক করে লোকাল ট্রেন Kobe পৌঁছলো এক শতাব্দী পরে ।
নেমেই চোখ গেলো উল্টো দিকের প্লাটফর্ম এ ।
ঠিক যেই সিটে বসে কফি খাচ্ছিলাম তার ওপর রাখা আমার ল্যাপটপ ব্যাগ।
এক চুল নড়ে নি!
ঠিক দেখছি তো?

"দিলওয়ালে দুলহানিয়া"র  লাস্ট সিনের  শারুখ-কাজল স্টাইলে ছুটে গেলাম। .....
চোখে জল,জড়িয়ে ধরলাম আমার ল্যাপটপ ব্যাগকে। 

ট্রেনের ভদ্রমহিলাকে মনে মনে "সরি" বললাম , সত্যি উনি জানতেন ওনার দেশ "বড্ড সেফ"!
তাই বলেছিলেন "পেয়ে যাবে"।

[এই রে আবার একটা গল্প মনে পড়ছে।....;-) ]

Wednesday, 16 May 2018

ভিন্ন স্বাদের ভ্যাকেশন


খুব একটা প্ল্যানিং না করে বেরিয়ে পড়লাম !
কর্তা অফিসের কাজে টুরে| তার মধ্যে দুদিন স্কুল অফিস ছুটি, উইক এন্ড নিয়ে চার দিন!
১৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে চার দিন বাড়িতে বসে থাকার কোনো মানেই হয় না!  এমনিতে সারা সপ্তাহ কাজের পর ছুটিতে বাড়িতে বসে থাকতে হয়তো ভালোই লাগে তবে এক্ষেত্রে সমস্যা দুইখান।
এক হলো, বাড়িতে থাকলে সংসারের কাজের কোনো শেষ নেই। ওয়াশিংমেশিন আর ডিশওয়াসার  যেন সারাদিন হাতছানি দিয়ে ডাকে । ঘরের কোনে কোথাও ধুলো, কোথাও ঝুল উঁকি মারে, শান্তি মনে বসতে দেয় না ।
দুই হলো এই যে তেরো বছরের ছেলেটি, ছুটি থাকলে তার হাত থেকে ওই সর্বনাশী মেশিনটা নামানো মুশকিল।  হয় ফোন, নয় ipad !!
উপরোক্ত দুই সমস্যার হাত থেকে খানিক মুক্তি পাবার আশায় দুইজন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম Groningen শহর এর পথে ।
ওখানে এক বান্ধবী অনেকদিন  ধরেই বলছিলো আসতে, হয়ে উঠছিলো না। 
সুযোগ হলো ।

অফিসে অনেকে শুনে বললো, দূর দূর ওখানে কিস্সু নেই । তারওপর  যখন শুনলো যে ১৩ বছরের ছেলে আর আমি যাচ্ছি, একজন বললো, একটু রিস্কি হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা? ওখানে ১৩ বছরের ভালো লাগার তেমন কিছু নেই। ছেলে বোর হয়ে যাবে একেবারে!
কেউ কেউ মুচকি হেসে বললো, "ভালোয় ভালোয় ঘুরে এসো ", কোথায় যেন সেই মুচকির মধ্যে একটু সাবধানবাণী !

যাগ্গে, ছেলেকে প্রস্তাবটা দিলাম ! তখন অবশ্য সব বুকিং হয়ে গেছে , তাই ঠিক প্রস্তাব নয় ।
এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা । জিজ্ঞেস করলো, "ওখানে গিয়ে কি করবো?"
যাচ্ছলে !এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক তৈরী ছিলোনা।

...মানে .....ওই টুরিস্টদের মতন ঘুরে ঘুরে শহরটা দেখবো!
[মা তখন যা মাথায় এলো বলে দিলো]

"কি আছে দেখার? আমি কিন্তু কোনো মিউজিয়াম যাবো না। আমি বেশি হাঁটবো না কিন্তু বলে দিলাম "

....আরে নানা, আমরা দুজন রিলাক্স করবো খালি। একটু বেরোবো, একটু হোটেলে থাকবো , একটু খাবো , ছবি তুলবো। ..ব্যাস!
[মা তখন আপ্রাণ চেষ্টা করছে মাথা ঠান্ডা রাখার]

"হোটেল এ নিশ্চয় wi-fi  আছে?'

...সে তো আছেই, সাথে সুইমিং পুল ও আছে।
[মা তখন প্লানটা ভালো লাগানোর জন্য মরিয়া]


"তাহলে কিন্তু হোটেল থেকে কোথাও বেরোবো না"

মা মাথা নাড়লো ।এক গাল হেসে মেনে নিলো ছেলে।
[মা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো , মনে মনে বললো, আগে তো চলো, তাপর দেখছি !!]

মা ছেলের এমনি ভ্যাকেশন  এই প্রথম ! 
খুব  হৈ  হৈ করে আমরা প্যাকিং করে ফেললাম। রাস্তায় খাবার জন্য ব্যাগে  চিপস, চকোলেট আর কিছু ফ্র্রুট জুস্ ।জামা কাপড় , সুইমিং কস্টিউম, গল্পের বই, ipad , বিভিন্ন রকমের চার্জার ইত্যাদি নিয়ে রওনা হলাম।
সত্যি কিন্তু একটা ভিন্ন স্বাদের  ভ্যাকেশন !

"মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে মা কে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে ........."


ট্রেনে বেশ খানিকটা রাস্তা, প্রায় আড়াই ঘন্টা। দুর্ভাগ্যবশতঃ  লাস্ট এক ঘন্টা আবার রেল লাইনে কাজ হচ্ছে বলে ট্রেন বন্ধ , তাই ট্রেন থেকে নেমে বাসের ব্যবস্থা। মজাই লাগলো, একটু যেন রোমাঞ্চকর । ছেলে অবশ্য মুখ গুঁজে তার হাতের মেশিন নিয়ে ব্যস্ত। মা মাঝে মাঝে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গল্প করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো। কখনো বা পুরো একটা গোটা বাক্য উত্তর কখনোবা কেবল হুঁ দিয়ে কাজ সাড়া উত্তর! মা তাতেই খুশি!
পিকনিকের মতন ব্যাগ খুলে মাঝে মাঝে চিপস বার করে খাওয়াতে অবশ্য ভুলছিলো না ছেলে ।

প্রথম হোঁচট খেলাম হোটেলের রিসেপশনে । হোটেলের মেন্ বিল্ডিং এ সুইমিং পুল আছে তবে সিটি সেন্টার এর এই ব্রাঞ্চ এ পুল নেই । আমার তো মাথায় হাত । ছেলে নিশ্চয় খুব দুঃখ পাবে, এই ভেবে পেছনে তাকিয়ে দেখলাম ছেলে মন দিয়ে wifi পাসওয়ার্ড নিচ্ছে । বেশি ঘাঁটালাম না । একটু দুঃখ পেলো ঠিকই তবে তেমন কিছু বড় আঘাত বলে মনে হলোনা । 
মালপত্র রেখে বন্ধুর সাথে তার বাড়ি গিয়ে সারা সন্ধে জমিয়ে আড্ডা মারলাম । Physics থেকে Philosophy --কিছুই বাদ গেলোনা। তারপর মন মাতানো রকমারি রান্না দিয়ে পেট পুজো সারলাম ।


পরের দিন আসল ভ্যাকেশন ফিলিং । সকাল সকাল হোটেল এ জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে । খুব সুন্দর সাজানো সিটি সেন্টার । ছোট ছোট দোকান, সুন্দর চার্চ , পাশে ক্যানাল , তাতে নৌকো, ...ছবির মতন । দিশাহীন ভাবে হেঁটে বেড়াতে খুব ভালো লাগলো। ১৩ বছরের ছেলের অবশ্য একটু ঘুরে পা টনটন শুরু হয়ে গেলো। শান্তি বজায় রাখতে উঠে পড়লাম নৌকায়, সাথে লাঞ্চ এ পিজা খাওয়াবার প্রতিশ্রুতি। রোদ ঝলমল দিন, ফুরফুরে হাওয়া , হাতে ক্যামেরা  ....দারুন রিলাক্স একটা ভাব। পাশে তাকিয়ে দেখলাম ছোট কর্তার মুখ চোখ ভীষণ ব্যাজার --এমন ভাবখানা যেন নৌকো ভ্রমণের মতন বিরক্তিকর কাজ আর দুটো হয়না ।
চোখাচোখি হতে বললো, "বোর হচ্ছি"..
এই জেনারেশন আবার খুব সহজেই বোর হয়ে যায়!!
একটু কথোপকথনের শুরু করার ইচ্ছে নিয়ে বললাম , 'দ্যাখ দ্যাখ ওই ব্রিজটা কি সুন্দর"...
উত্তর এলো,  "exactly same ব্রিজ একটা Den Haag এও আছে"
দমে যাবার পাত্রী আমি নই। ..
বললাম, "same নয়. তবে হয়তো similar "
চালাক ছেলে, দেখলো মা এর এই মুড বজায় রাখার জন্য চুপ থাকাই  ভালো।....
;-)
নৌকো বিহার সেরে খুঁজে পেতে ঢুকলাম গিয়ে এক ইতালীয় রেস্তোরাঁয়। ....দুজনের পেটেই তখন ছুঁচোদের কীর্তন শুরু হয়েছে । ফুটবল ফিল্ডের মতন সাইজের পিজা এসে গেলো। খুশিমনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম দুজনে । পেটে  খাদ্য ঢুকলো, আমাদের গল্প ও শুরু হলো । নানা রকমের টপিক। লাইফ আর বোরিং রইলো না, খাদ্য রসিকরা জমিয়ে খেলো। বন্ধুর মতন শেয়ার হলো অনেক গল্প ।


এরপর আরো কিছুক্ষন ঘুরে বেড়াবার ইন্ধন পেটে নিয়ে আমরা আবার হাঁটলাম।



"মা এই মিউজিয়াম তা দেখতে চাই"
ঠিক শুনছি তো? কি বললে?
"মিউজিয়াম তা মনে হয় ইন্টারেস্টিং হবে, লেখা আছে "Welcome Modern Man "..

পুত্রের এহেন অনুরোধ এ যারপরনাই খুশি হয়ে মাতৃজননী তৎক্ষণাৎ টিকিট কেটে ভেতরে।....
এক্ষেত্রে ভেতরে ঢুকে অবশ্য মাতৃজননী একটু নিরাশ হলেন। ওই মডার্ন আর্ট ব্যাপারটা আবার আমি ঠিক ভালো বুঝিনা । এখনো পাহাড় নদী সূর্য ফুল , এইসব দেখতেই ভালো লাগে ।যীশুখ্রিষ্টর পেটের ভেতর থেকে একটা কঙ্কালের হাত বেরিয়ে আছে,  কিংবা জলপ্রপাতের সামনে একটি মৎসকন্যা  একটা কাঁটা গাছ কোলে নিয়ে বসে আছে....এই ধরণের আর্ট আমার মাথা কিংবা হৃদয় কেউই বোঝে না ! 
ফলে ব্যাজার মুখে বেরিয়ে এলাম।
নাহ , এবার একটা কফি খেতেই হচ্ছে। ..

ক্যানালের ধারে বসে লোকজন দেখতে দেখতে কফি খেলাম। বিকেলে আবার বান্ধবীর সাথে আড্ডা আর Thai রেস্তোরায় খাওয়াদাওয়া।
Total chill !!!

শনিবার বাড়ি ফেরার পালা।..
ট্রেনে উঠে বললাম, "বেশ কাটলো, তাই না? তোমার কি ভালো লাগলো সব থেকে বেশি?"

"Groningen এ বেস্ট লাগলো. .....হোটেলের wi -fi টা !! দারুন strong ছিল!"

বোঝো ঠেলা!  সত্যি "ভিন্ন স্বাদের ভ্যাকেশন ".......................
;-)


Saturday, 5 May 2018

M&M:মিটিং ও ম্যানেজার!


Dilbert ভায়া কি আর এমনি এমনি পপুলার?
;-)



টিম মিটিং এ বোঝাই দেখি আমার ক্যালেন্ডার,
জীবনখানা বিষিয়ে দিলে, মিটিং ও ম্যানেজার!

চলবে মিটিং এক ঘন্টা, কুঁচকে কপাল ভুরু,
চশমা এঁটে, ব্যাজার মুখে, মিটিং হলো  শুরু !

মুখের ভূগোল এমন কঠিন, লক্ষী মায়ের প্যাঁচা,
রামগরুড়ের মাসতুতো ভাই, এমনি ব্যাটা খেঁচা!

এদিকে ওদিক তাকিয়ে ভাবি, এ কি শুধুই আমি?
কাজের নামে কেবল মিটিং, রাজ্যের ভণ্ডামি?

দিবারাত্র মিটিং মিটিং, করবো কখন কাজ?
পান থেকে চুন খসলে পরে মাথায় তেনার বাজ!

ভালো করে চেয়ে দেখি, সবার একই দশা,
কফির কাপে মুখ লুকিয়ে , চুপটি করে বসা!

মাথা নিচু, কেউ বা দেখি ঢুলছে আপন মনে,
চশমা চোখে বিজ্ঞ ভাবে বসে ঘরের কোনে !

কেউবা দেখি শিল্পী মানুষ আঁকছে পাহাড় নদী,
এইভাবেই খানিক সময় কাটানো যায় যদি !

কেউ খেলছে নিজের সাথেই খাতায় কাটাকুটি,
কেউ আঁকছে বস বাবাজির মাথায় রঙিন ঝুঁটি!

আলপনাতে কেউবা ভরায় বসে মিটিং খাতা,
কেউবা নোটস নিতেই থাকে, পাতার পর পাতা !

হঠাৎ দেখি কেউবা যেন উঠলো নড়ে জেগে,
নিজের কাজের ঢাক পেটালো, প্রবল ঝড়ের বেগে!

কেউবা তাতে করলো চ্যালেঞ্জ, চড়িয়ে উঁচু গলা,
দশটা কথা বললো বেকার, যা দু-শব্দে যায় বলা!

মিষ্টি হেসে বসের মাথায় ঢাললো বা কেউ তেল,
পিঠচাপড়ে, ল্যাংড়া বলে দিলো বেচে বেল!

কেউ তাকায় ঘড়ির দিকে সেকেন্ডে দশ বার,
করলে এমন ঘড়ির কাঁটা ছুটবে আশা তার!

কেউবা বসে লিখছে ছড়া , গেলই ভারী বয়ে,
ছন্দ যখন আসে, সে কি আসে বলে কয়ে?

মুখে চোখে তবু সবার ভাবখানা রাশভারী,
সমস্যা World  Hunger, যেন হচ্ছে মিটিং তারই !

যতই করি ছন্দ ছড়া, মিটিং নিয়ে মজা,
মাসের শুরু মাইনে হাতে, এক্কেবারে রাজা!,

বরং কুঁচকে ভুরু মনোযোগের করি অভিনয়,
পেটের দায়ে জোরসে বলি, M & M এর জয়!




cartooncourtsey: focusadventure.in


Thursday, 26 April 2018

বহুরুপি

















আমি নাকি মাঝে মাঝে
দুষ্টু ছেলে বড়,
আবার মাঝে মাঝে মিষ্টি হাসি
লজ্জা জড়সড়|
কখনোবা রেগে আগুন
জেদে ছিঁড়ি চুল,
বসে থাকি গোমড়া মুখো
যদিও জানি ভুল।
কখনোবা ফোয়ারা হাসির,
কারণ নেইকো জানা,
লুটোপুটি খিলখিয়ে 
আহ্লাদে
 আটখানা।
কখনোবা ছিঁচকাঁদুনে
দুচোখ করি লাল,
কিংবা ভীষণ অভিমানে
ফুলিয়ে থাকি গাল।
কখনো বা উদাস চোখে 
স্বপ্ন বিভোর হই,
খাটের তলায় লুকিয়ে বলি 
বলোতো আমি কই ? 
কখনোবা ভালো ছেলে 
মায়ের কোলে বসা,
কখনো ছুটি দিশেহারা 
পাগল করা দশা !!
 মা কে বলি ,"এত রূপের
কোনটা তোমার প্রিয়?"
মা বলে, "বহুরুপি ছেলে আমার  
সব রূপ-ই অতুলনীয় " !!!


Monday, 20 November 2017

Choose your battles wisely yaar!!!


pc: quotemaster.org


দমবন্ধ হচ্ছে দেশের, মাস্ক লাগছে মুখে,
নিঃশ্বাসে বিষ,তবু দেখো নেতা ঘুমোয় সুখে!

জগৎসুন্দরী মুকুট, আনছে দেশের মেয়ে,
প্লাটফর্মে কমলা ঘুমোয় আধপেটা জল খেয়ে!

যুবক পাগল পড়ার চাপে, কাটছে কারো গলা ,
হারায় শৈশব বইয়ের তলে, মিছে এসব বলা!

রানী বলে হায়রে কপাল,মরেও শান্তি নাই,
ইতিহাসের পাতায় বেশ তো ছিলাম ভাই।
পদ্মাবতী তোদের ঘরে, আঁচলে মুখ ঢাকা,
আমাকে নিয়ে ধর্ণা, তার বেলা সব ফাঁকা ?
আমার মান এতই প্রিয়,আমি তো ইতিহাস,
ভবিষতের পদ্মাবতী মায়ের পেটেই নাশ?

ভুলভাল লড়াই এ মেতে জীবন অপচয়,
ভোটপূজাটাই আসল? মানবিকতা নয়?

দিবিই যখন ধর্ণা তোরা, করবি অনশন,
ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দেবার কর না তবে পণ!

ভাব না বরং কোন সমস্যার করবি প্রতিকার,
বুদ্ধি যখন আছে ঘটে, Choose your battles wisely yaar!!!

Sunday, 22 October 2017

জাপান কাহিনী ৪ :পুলিশ!! পালাও!!


জাপান এর কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে । মনে হয় যেন আগের জন্মের কথা ।
(জাপান কাহিনী ১ , ২,৩  প্রকাশিত)

আসলে জীবনের নানা ঘটনার সাথে নানা স্মৃতি জড়িত থাকে। সুযোগ সুবিধে বুঝে সেই স্মৃতি আবার উঁকি মারে। এমনি এক লুকোনো স্মৃতি হঠাৎ উঁকি মারলো দুর্গাপুজোর সময়, ভাবলাম লিখে ফেলি।

২০১৭। সেপ্টেম্বর মাস ।
হল্যান্ডে বসে অষ্টমীর দিন ভোগ খাচ্ছিলাম । কি অপূর্ব স্বাদ, গোবিন্দভোগ চালের গন্ধ, পুজোর আমেজ। মন চলে গেলো বেশ কিছু বছর আগের এক ঘটনায় ।
না ছিল পুজো,না ছিল ভোগ, না ছিল গোবিন্দভোগ চাল   .......

Kobe   (pc :www.jnto.go.jp)


১৯৯৬। অক্টোবর মাস । এক মাস হলো জাপান এ এসেছি ।
এমনিতেই হোম সিকনেস তুঙ্গে, তারওপর আবার দুর্গাপুজো!
যতবার ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাই মনটা খারাপ হয়ে যায়..........

আমাদের International hostel টা  Kobe পোর্ট এর খুব কাছে ছিল । হঠাৎ সেদিন জানা গেলো যে Kobe পোর্টে একটি ভারতীয় জাহাজ এসেছে। এক মহারাস্ট্রিয়ান স্টুডেন্ট এই খবরটা এনে দিলো। সাথে এও  বললো যে ওর এক বন্ধু জাহাজে চাকরি করে এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন নাকি বাঙালি, Mr. Roy, জিজ্ঞেস করছিলেন এখানে কোনো বাঙালিকে ও চেনে কিনা।

একে বাঙালি ক্যাপ্টেন , তারওপর Roy, তারওপর দুর্গাপুজো, সেদিন ছিল মহাষ্টমী!
শোনামাত্র হোমসিকনেস ছাপিয়ে উঠলো, মন কেঁদে উঠলো একটু বাংলা বলার জন্য, জেগে উঠলো বিদেশে দেশোয়ালি প্রেম।
যদিও ততদিনে হোস্টেলে দুই বাঙালি দাদা (A-দা , K-দা ) থাকাতে  বাংলা বলার সুযোগের কোনো অভাব ছিলোনা .....তবুও  ......

জাহাজের সমস্ত ডিটেলস নিয়ে আমি আর K -দা পৌঁছে গেলাম পোর্ট এ । কমন বন্ধুর সাথে আলাপ করে পৌঁছে গেলাম জাহাজে। কি বিশাল জাহাজ (নামটা ভুলে গেছি)। আমি জীবনে অত বড় জাহাজে আগে উঠিনি । ক্যাপ্টেন ছিলেন না বলে আমাদের অন্য একজন পুরো জাহাজ ঘুরিয়ে দেখালেন। নিচের ডেকে কত লোকজন, অনেকের সাথে আলাপ ও হলো। ওপরের ডেকে বসে চা খেলাম, অপেক্ষা করতে লাগলাম ক্যাপ্টেনের জন্য! জাহাজের বেশিরভাগ লোকজন দক্ষিণ ভারতীয়, তাই "আজ অষ্টমী" ফিলিংটা  তখনও ঠিক আসছিলো না ।
একটু পরে ক্যাপ্টেন ফিরে এলেন, আমাদের ডাকলেন ওনার কেবিনে । সাথে ওনার স্ত্রী ও  তিন বছরের মেয়ে। এইবার বেশ ভালো লাগলো। বাংলায় কথা বলতে পেরে মন খুশি হলো।

প্রথম দেশের বাইরে গেছি, মহাষ্টমীর দিন এক বাঙালি পরিবারের সাথে সুদূর জাপানে বসে গল্প করার যে কি আনন্দ তা লিখে বোঝানো যাবে না ।ওনারাও বার বার বললেন "আজ অষ্টমী, দেশের বাইরে ভালো লাগে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।"
সমব্যথী পেয়ে মন আরো খুশি !

খাওয়া দাওয়া হলো, এবার হোস্টেলে ফেরার পালা।
ক্যাপ্টেন Roy বললেন, "তোমরা স্টুডেন্ট, আজকে পুজোর দিনে, কিছুই দিতে পারছি না তোমাদের। তবে ভালো গোবিন্দভোগ চাল আছে, তোমরা কিছু মনে না করলে আমি দিতে চাই "।

আমার সত্যি স্টুডেন্ট মানুষ । জাপানে এ বসে গোবিন্দভোগ চাল পাবার আনন্দে সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়  নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। ক্যাপ্টেন পরিবারকে অসংখ ধন্যবাদ জানিয়ে গোবিন্দভোগ চালের প্যাকেট হাতে নিয়ে খিচুড়ি আর পায়েসের স্বপ্ন দেখতে দেখতে আমি আর K-দা হোস্টেলের দিকে হাঁটা দিলাম!

পোর্ট থেকে বেরিয়ে গোটা ১০মিটার গেছি।.....ব্যাস।...
হটাৎ সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি। ঠিক যেন হলিউড সিনেমার সিন্।
আমাদের দুজনকে ঘিরে  তিনটে পুলিশ গাড়ি এসে দাঁড়ালো ।
ব্রেকের আওয়াজ  ...ক্যাঁচ ক্যাঁ.......চ !!!
ভয়ে আমরা স্ট্যাচু !

বন্ধুকধারী দুই পুলিশ গাড়ি থেকে নেমে জাপানিতে  কি যে বললো চিৎকার করে কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে কথার সুর এবং মাত্রা শুনে মনে হলো না ভালো কিছু বলছে। তাকিয়ে থাকলাম ফ্যাল ফ্যাল করে.....তখন একমাস ও হয়নি জাপানে। ভাষাটা একেবারেই বুঝিনা।
ওদের মধ্যে একজন আমাকে হাত তুলে ইশারায় কি যেন বললো। তাও বুঝলাম না।
এক পা নড়তেই একজন পুলিশ এক ছুট্টে একদম আমার কাছে। ততক্ষনে  তো আমার অবস্থা ঘাবড়ে ঘ। খেয়েছে , গ্রেফতার করবে নাকি? কি করলাম? K -দার ও একই অবস্থা ।
কেলেঙ্কারি কান্ড!

আমার ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে পুলিশ বাবাজি আরেকটু এগিয়ে এলো......আমি তখন আমতা আমতা করে বললাম, "actually we are  university students, we came to meet a friend..'
উনি কিছু বুললেন না, পাশের গাড়ি থেকে আরেক পুলিশকে ডাকলেন ।তার মনে হয় ইংরিজি সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ ছিল । তার ও হাতে বন্দুক!
সে চালের প্যাকেটটা  দেখিয়ে বললো "what in packet? down down"
[আমি ততক্ষনে ভয়ে চালের প্যাকেট এমন জাপ্টে ধরে আছি যেন প্রাণ গেলেও চাল যেতে দেব না]

নামিয়ে রাখলাম মাটিতে।....খুলে দেখালাম, বললাম,
"Rice, gift from captain, ship , India"
[ততদিনে বুঝে গেছি জাপানে কি করে ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে কথা বলতে হয়]

পুলিশ বাবাজি এমন ছিটকে উঠলো যেন প্যাকেট এ চাল নয় কেউটে সাপ দেখেছে।
বললো "Rice! Rice! no allowed!! port customs!, go back go back"

আমাদের তখন "ছেড়ে দেমা  কেঁদে বাঁচি " অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে চালের প্যাকেট এগিয়ে দিলাম পুলিশের  দিকে।উনি এক পা পিছিয়ে গেলেন। জাপানিতে আবার কি সব বললেন, সুর এবং মাত্রা উঁচু!
পাশের ইংরিজি সেকন্ড ল্যাংগুয়েজ পুলিশ এগিয়ে এসে বললো  "no no, you go you go ..rice back "

"K-দা, মনে হচ্ছে বলছে নিজেদের গিয়ে ফেরত দিতে হবে"......

গুটি গুটি পায়ে ফিরলাম পোর্ট গেটে । কোনোরকমে চালের প্যাকেট পোর্ট এর অফিসে ফেরত দিলাম।অফিসার গেস্ট রেজিস্টারে নাম চেক করে বললেন, "Call Captain Roy? help?"

আমরা তখন কোনো রকমে হোস্টেলে ফিরতে পারলে বাঁচি ! চুলোয় যাক গোবিন্দভোগ চাল।
বরং গোবিন্দকে ডাকছি , হে ভগবান রক্ষে করো, বাঁচাও এই বিপদ থেকে!
"আরিগাতো আরিগাতো " বলতে বলতে একদম about turn !
[একটাই ওয়ার্ড শিখেছিলাম ততদিনে, আরিগাতো , মানে thank you ]

হোস্টেল ফিরে শুনলাম যে কিছু জিনিস পোর্ট এর বাইরে  নিয়ে যাওয়ার অনুমতি থাকেনা । চাল ও সেই লিস্টের একজন । ক্যাপ্টেন Royএর  নিজের হাতের সই করা অনুমতিপত্র থাকলে কোনো অসুবিধে হতো না । হয়তো বা তাড়াহুড়োতে উনি ভুলে গেছিলেন দিতে।
যাগ্গে, অষ্টমীতে খিচুড়ি বা পায়েস কোনোটাই খাওয়া হলো না। পুলিশের হাত থেকে বেঁচে ফিরে আসার খুশি গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি খাওয়ার থেকে অনেক বেশি !

************************************~~~~~~~********************************

......দিন কাল পাল্টে গেছে । আজকাল সব কিছুই প্রায় পাওয়া যায় দেশের বাইরে । জীবনের চাহিদাগুলোর ও অনেক পরিবর্তন হয়েছে । সচেতনতা ও অনেক বেড়েছে ।
এখন কোনো স্টুডেন্ট অষ্টমীর দিনে এমনি ইমোশনাল হয়ে  পোর্টে গিয়ে গোবিন্দভোগ চাল নিয়ে আসবে বলে মনে হয় না.........
হয়তো Facebook এ স্টেটাস আপডেট দেবে "feeling emotional, missing gobindobhog chal"
;-)










Wednesday, 6 September 2017

Chill, chill...just chill.....



[Scene]:  মা দুগ্গা প্যাকিং করছেন মর্তে আসার জন্য ।
ঘরদোর ছত্রাকার । বাবা বিশ্বনাথ এক এক করে সুটকেস নামিয়ে দিচ্ছেন আলমারির মাথা থেকে।


মা: আর তো বেশি দিন নেই মর্তে যাবার।যে যার নিজের সুটকেস প্যাক করে ফেলো, ওখানে গিয়ে এটা পাচ্ছিনা, ওটা পাচ্ছিনা যেন শুনতে না পাই।

বাবা: গিন্নি, যাচ্ছো তো বাপের বাড়ি, একটু chill !

মা: সেই, আমি chill করলে হয়েছে আর কি! তুমি তো বলেই খালাস।তোমার তো chill ই chill । সংসারের সব দায়িত্ব তো আমার  .....

বাবা: আহা মাথা গরম করো কেন গিন্নি। লাল কাঞ্জিভরামটা অবশ্যই নিও সুটকেসে...ওটা পড়লে তোমাকে দারুন লাগে!স্পেশালি আরতির প্রদীপের আলো যখন তোমার মুখে  .....

মা: থাক, বেশি কথা বোলো না। কি তোমার এমন কাজ কৈলাশে যে ৪ দিন ছুটি পাবে না? এমনিতেই তেলের দাম কমে যাওয়াতে সব প্রজেক্ট বন্ধ!

বাবা : আহা, অন্যান্ন প্রজেক্ট তো সব চলছে! দেখছো না সমস্ত জগৎ এখন renewable এনার্জি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। কোনো দেশ সূর্যের আলো চাইছে তো কোনো দেশ বেশি হাওয়া- এতো সব মাথায় রেখে আমার ছুটি পাওয়া একেবারে অসম্ভব! শুধু আমার না, ইন্দ্র, বরুন, পবন --সবার ছুটি ক্যানসেল হয়ে গেছে ।

মা: কি জানি বাপু, এমন ভাবখানা করো যেন আমার কোনো কাজ-ই নেই। যা ছিল তা তো ছিলই, এখন আবার ডিফেন্স মিনিস্ট্রি ও এসে পড়লো আমার ঘাড়ে। যাগ্গে এই বাপের বাড়ি যাবার মুখে আর এইসব ঝগড়া ভালো লাগে না।
..এই লক্ষী সরস্বতী কার্তিক গণেশ ......কই গেলি সব?

ছেলেমেয়েরা: [সমস্বরে] : যাই মা.......

লক্ষী :  মা আমি কিন্তু এবার আমার ভাঁড় ছাড়া কোথাও যাবো না। একেই গতবারের সব ৫০০ টাকার নোট গুলো জলে গেলো। তুমি ওখানে কিছু কিনতে দিলে না আর ফিরে এসে ব্যাস, demonetisation! আমি আর রিস্ক নেবো না এবার, ওখানে যা প্রণামী পাবো সব খরচা করে ফিরব। শুনছি এবার পুজোর বাজারে লিনেন শাড়ি খুব চলছে!


মা: আহা বাছা, রাগিস কেন? সুন্দর গোলাপি রঙের ২০০০ টাকার নোট বেরিয়েছে তো! 

লক্ষী: কিছু বিশ্বাস নেই, রাতারাতি উধাও হয়ে যেতে পারে!
একমাত্র খুচরো পয়সা সেফ । তবে পয়সা যেন কেমন খোলাম কুচি হয়ে গেছে।কোনো ভ্যালু নেই !আমার ভাঁড় দেখলে লোকজন হাসে! এক বাড়িতে গত বিস্সুতে দক্ষিণার থালায় ঠঙ করে আওয়াজ হওয়াতে পুরুত মশাই না দেখেই রেগে বললেন, 'ওই দক্ষিনা লক্ষীর ভাঁড়ে ঢেলে দাও".....

সরস্বতী: আর আমিও বলে দিলাম, আমি বই খাতা পেন নিয়ে যাবো সঙ্গে। গতবার ভাইদের পাল্লায় পরে ipad নিয়ে চলে গেছিলাম!! কি কেলেঙ্কারি। অর্ধেক প্যান্ডেলে wi-fi নেই । যেখানে আছে সেখানে ভাইরাস এর ছড়াছড়ি! 

মা: আহা বাছা, রাগিস কেন? এই সব যন্ত্র তো মানুষ বানিয়েছে নিজেদের সুবিধের জন্য।

সরস্বতী: সুবিধে? সুবিধে করতে গিয়ে সব হাতের লেখার কি অবস্থা হয়েছে দেখেছো? আর বানানের কথা নাই বা বললাম! tweet করতে শিখে যেন মাথা কিনে নিয়েছে! Could কে cud, the কে d, great কে gr8, এমনকি একটা দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে Covfefe?? কোনো মানে হয়? আমার মাথা গরম হয়ে যায় এইসব দেখলে!

কার্তিক: আমার ও experience তেমন ভালো না। সবার হাতে ওই একটা যন্ত্র হয়েছে। এতো করে বাবরি চুল সেট করে গেলাম! সবাই নিজের selfie তুলতে এমন ব্যস্ত, কেউ তাকিয়ে পর্যন্ত দেখলোনা! উল্টে parlour-এর টাকাটা আমার একেবারে waste! আমি ভাবছি এবার যাবোই না।

মা: আহা বাছা, ধৈর্য ধর।

গণেশ: এবার আমিও রিস্ক নেবো না। সাথে নেবো Himalaya ঘি এর শিশি।এখন মর্তের লোকেরা এতো বেশি ডায়েট নিয়ে ভাবছে যে লাড্ডুগুলোর কোনোই স্বাদ নেই...স্বাদ থাকবে কি করে? না আছে চিনি, না আছে ঘি ! এদিকে কিলো কিলো extra cheese দিয়ে Domino pizza খাচ্ছে! কি বিস্বাদ, আমার ইঁদুর পর্যন্ত মুখে তুললো না! তারওপর হয়েছে কি এক নতুন 'জলাঞ্জলি' ব্র্যান্ড -সে তো ঘি নয়, সে হলো গিয়ে..যাগ্গে।মর্তের লোক ভাবছে ওই ঘি খেলে ওইরকম পেট হবে! আরে বাবা সবাইকে তো তুমি শিল্পা শেঠি বানাও নি !!

মা: এতো মহা মুশকিলে পড়া গেলো! আগে মামাবাড়ি যাবো বলে কি উৎসাহ ছিলো, আজকাল সেই উৎসাহে কেমন জানি একটু ভাটা পড়েছে! সত্যি বলতে কি আমার ও গতবার থেকে মনটা একটু খারাপই।সব কিছু কেমন জানি বদলে যাচ্ছে।
কি যে এক বাবা-কালচার শুরু হয়েছে, গুন্ডা চরিত্রহীন লোকজনদের বাবা-বাবা বলে তোরা মাথায় তুলে নাচ্চিস!কেন? কোন জিনিষটা ওর আছে যা তোদের নেই?বানিয়েছি তো আমিই।নিজেদের ওপর বিশ্বাস না রেখে আরেকজনের প্রতি অন্ধ ভক্তি কিসের? ঐটুকু বুদ্ধি তো আমি দিয়েছি বলে মনে হয় ।
তারপর হয়েছে গুচ্ছের বাংলা সিরিয়াল, না আছে কোনো মাথা না আছে কোনো মুন্ডু। শাশুড়ি আর ননদের বিষে ভরা! ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের দিয়েও কি সাংঘাতিক কুটিল চরিত্রের অভিনয়! আর তাই বসে ঘন্টার ঘন্টার দেখছে মর্তের লোকাল দশভূজারা।এদিকে মুখে women empowerment নিয়ে কথা!
আজকাল আমার থেকে আমার প্যান্ডেলের দাম বেশি।এক গাদা টাকা খরচ করে বানাচ্ছে সাবানের প্যান্ডেল, কিংবা দেশলাইকাঠির কিংবা প্লাস্টিকের গ্লাসের ! ওই প্যান্ডেলে আমার দম বন্ধ লাগে !পুজোর প্যান্ডেলের যা বাজেট, তাতে ছোট্ট একটা স্কুল তৈরী হয়ে যায়! একটু ভেবে দেখ, চার দিনের সাবানের প্যান্ডেল নাকি ৩৬৫ দিনের স্কুল? একটু মাথা খাটা বাছারা  .......
কোনোরকমে নমঃ নমঃ করে পুজো সেরে সবাই বেপাত্তা হয়ে যাস। প্যান্ডেল খালি খাঁ খাঁ করে! কারণ তখন প্যান্ডেলের বাইরে মাইক এ সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম এ বাজছে "বেবিকো base পসন্দ আয়া!" খুব বড় আর্টিস্ট, কোথায় যেন প্রাইজ পাওয়া। কোথায় গেলো সেই পুজো সংখ্যার গান কিংবা সেই সানাইয়ের সুর?পাড়ার ছেলেমেয়েরা কোমর বেঁধে ধুনুচি নাচ ও করে না। হাতে ফোন, সর্বক্ষণ!
অষ্টমীর দিনটা বড়  ভালো লাগতো খিচুড়ি ভোগ আর লাবড়া খেতে। তা সেও নাকি আজকাল আর কারুর ভালো লাগে না--বড্ড সেকেলে, বড্ড  একঘেঁয়ে, বড্ড carbs !
সব থেকে খারাপ লাগে তোদের ঝগড়া দেখে! যখন বানিয়েছিলাম তখন একদম সেম টু সেম বানিয়েছিলাম। দুটো চোখ, দুটো কান, একটা নাক, লাল রক্ত, সোনার হৃদয়! এখন তার ওপর তোরা নিজেরা কত বিভেদ যে বানিয়েছিস। সারাক্ষন কিছু না কিছু নিয়ে ঝগড়া করে চলেছিস।
খুব কষ্ট হয়, প্রাণ কাঁদে !
এমনি চলতে থাকলে আমার ও বাপের বাড়ি যাওয়া নিয়ে হয়তো ভাবতে হবে!

[শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে]

Knock Knock !

অসুর: মা ঠাকরুন, আসতে পারি?

মা: হ্যা এসো, তুমিও প্যাকিং করে নিও। আর দয়া করে রাস্তায় behave yourself!

অসুর: নানা কি যে বলেন  মা ঠাকরুন। তবে খুব সত্যি কথা বলতে গেলে, খবরের কাগজ তো আমিও পড়ি !মর্তে গিয়ে হয়তো দেখবেন আমিই সব থেকে well behaved ! শুধু শুধু অসুরকুল বদনাম, মর্তে তো গুরু বা বাবারা অসুর থেকে কোনো অংশে কম নন ।
যাগ্গে, যা বলছিলাম। আমার দুইখান কথা আছে। বয়স হচ্ছে, টানা চারদিন ওই ভাবে ত্রিশূল এ নিচে বেঁকে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কষ্টকর। পিঠের spondylitis এর ব্যাথাটা বেড়ে যায়, আর মাঝে মাঝে ওই সিংহের চুলগুলো নাকে ঢুকে হাঁচি পায়। একটু নড়লে আবার হাঁস আর পেচাঁ দুদিক থেকে খোঁচা মারে, ওই যে "কাদায় পড়লে হাতি etc ", আর কি। আজ্ঞে তাই বলছিলাম যদি অনুমতি দেন তবে ওই কলাবৌ-এর পাশে একটু জায়গা খালি থাকে, গিয়ে দুদণ্ড বসতে পারি ।
এছাড়া, এবার খুব ইচ্ছে একটা bellbot pant পড়ার। অনুমতি হলে একটা কিনে আনি। সেদিন Sholay দেখছিলাম, উফফ কি ব্যাপক লাগছিলো ওই মর্তের অমিতাভ বচ্চন কে! জানি  Pink হিট, তেমনি Piku ও হিট, তবে Sholay -র ধারে কাছে আসেনা! আপনারা তো থিম পুজোয় নানা সাজে সাজেন, আমার সেই এক রঙিন সিল্কের খাটো ধুতি বড্ড একঘেঁয়ে হয়ে গেছে! শুনছি পুরোনো স্টাইল আবার ফিরে আসছে, তাই বলছিলাম যদি একটা bellbot  .....আর হ্যাঁ, বলছিলাম যে  ..ইয়ে মানে  ..বলছিলাম আমার ও একটা স্মার্ট ফোন চাই! ডাকিনীর সাথে whatsapp করতে চাই। ....

মা: আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে, বেশি বকবক করো না। রেডি হও। মোষটাকে একটু ভালো করে চান করিও ।
কলা বৌ, ও কলা বৌ, এক কাপ চা খাওয়াও দেখি। পাকিং করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলাম .....
সব তো আমাকেই সামলাতে হবে। ওনার তো আর টিকিটি দেখা যাবে না । সুটকেস নামিয়ে দিয়েই হাপিস ..

[মা দুগ্গা গজ গজ গজ গজ করতে করতে খাটে বসে পড়লেন]