![]() |
.....সব রকম প্রণাম আমার খুব ভালো লাগে।
বাড়িতে বরাবরই প্রণামের খুব রেওয়াজ । মা বাবার কড়া হুকুম গুরুজনদের প্রণাম করতেই হবে।জন্মদিনে প্রণাম,পয়লা বৈশাখে প্রণাম, বিজয়া দশমীতে প্রণাম, পরীক্ষা দিতে বেরোবার আগে প্রণাম, রেজাল্ট বেরোলে প্রণাম ...প্রণাম ছিল দৈনন্দিন জীবনের একটা অঙ্গ। গুরুজন মানেই প্রণাম, কোনো নড়চড় নেই। সেই প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করার কথা কোনোদিন মাথায় ও আসেনি, আসতে দেওয়াও হয়নি।মা একবার কটমট করে চোখ পাকিয়ে তাকালে হাঁটুর নিচ থেকে ইঞ্চি ছয়েক মতন একেবারে জেলি হয়ে যেতো।বাবা চোখ পাকালে যে কি হতো সে আর বলে লাভ নেই।
তাই প্রচুর প্রণাম করেছি জীবনে।
কখনো বা মন থেকে, কখনো বা চাপে পড়ে।
কখনো কারুর পা ছুঁয়ে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে , আবার কখনো পা ছুঁতে গিয়ে মনে হয়েছে "ইশ গোড়ালিটা বড্ডো ফাটা "!
কখনো মাথার ওপর যেন আশীর্বাদ অনুভব করতে পেরেছি আবার কখনো পেয়েছি নির্লিপ্ত অবজ্ঞা!
তবে যাই বলিনা কেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস যেটুকু ইতিহাস ভূগোলের নম্বর পেয়েছি, সব ওই প্রণামের দৌলতেই। ঐসব বিষয়গুলো পড়াশোনা করে পাস্ করার মতন ক্যালিবার আমার কোনোদিন ছিলোনা। কাকা কাকী মামা মাসি দাদু দিদা জেঠু জেম্মা ..এদের প্রণামের পরিবর্তে যে আশীর্বাদ পেয়েছি তাই দিয়ে কোনোরকমে এখানে এসে পৌঁছেছি ।
যাগ্গে যা বলছিলাম। প্রনামে বিশ্বাসী, প্রণাম ভালোবাসি ঠিকই তবে খুব সুন্দর ভাষায় প্রণামের উপকারিতা কিংবা লাভ নিয়ে আলোচনা করার সামর্থ আমার নেই ।যুক্তি তর্ক দিয়ে প্রণামের বিপক্ষের লোকজনকে সন্তুষ্ট ও করতে পারবোনা।
ভালো লাগাটা একান্তই নিজের অনুভব ।
তবে যত বয়স বেড়েছে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি --- প্রণামের সাথে কোথায় যেন গভীর ভাবে একটা বিনয় বা নম্রতার শিক্ষা জড়িয়ে আছে । কারুর পা ছুঁলে যে নিজের মান যায়না, সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছি ।আরো বুঝেছি যে যেটাকে আমরা "আশীর্বাদ" বলি সেটা আসলে যাকে প্রণাম করলাম তার পসিটিভ এনাৰ্জি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিন্তু বেশ পাওয়ারফুল।
এটাও নিজের অনুভব, নিজে প্রণাম পাওয়ার পর বুঝতে পেরেছি ! যে আমাকে প্রণাম করে তাকে মন উজাড় করে ভালো ভালো কিছু দিতে ইচ্ছে করে।
এক কথায় পসিটিভ এনাৰ্জি!
জীবনে অনেক ধরণের প্রণাম করেছি।
অনেক বছর আগে দুর্গাপুর থেকে আমরা এক ঝাঁক মেয়ে যেতাম বেনারস এ (BHU )পড়তে । কলকাতা থেকে সব বেনারসগামী ট্রেনই রাতেরবেলা দুর্গাপুর এর ওপর দিয়ে যেত। কালকা মেল্, পাঞ্জাব মেল, দুন এক্সপ্রেস। .....। টাউনশিপ থেকে স্টেশন অনেক দূর। বাবারা ট্রেনে চাপাতে যেতেন আমাদের । কারুর কারুর মাবাবা দুজনেই। স্টেশনে পৌঁছে নানা উত্তেজনা, অল্প মনখারাপ, বাবা মার লাস্ট মিনিট ইন্সট্রাক্শন।...
ব্যাগটা সামলে নিস......
জলের বোতলটা ট্রেনে ফেলে নেমে যেও না....
সুটকেসটা সাবধান, লক্ষ্য রাখবে, গয়া স্টেশনটা সুবিধের না।
পৌঁছেই একটা ফোন করে দিস। ....
ট্রেন আসার announcement যেই না হলো, ব্যাস, প্রণামের হিড়িক পরে যেতো প্ল্যাটফর্ম এ ।গোটা ২০ টা মেয়ে, ঢুলু ঢুলু চোখ, পার হেড দুটো করে বাবা মা, চারটে পা, অন্ধকার প্লাটফর্ম, ট্রেনের ভিড়....তার মাঝে প্রণাম! সে এক কেলেঙ্কারি! ঢিপ ঢিপ ঢিপ। ...
কার কার পায়ে যে ফাইনালি প্রণাম করতাম কোনো ঠিক নেই । কাকু কাকিমারা 'আহা থাক থাক' বলতেন কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা , প্রণাম করবই। ট্রেন থামবে মাত্র ৪ মিনিট । এক কাকু বলতেন, তোদের প্রণামের ঠেলায় একদিন ট্রেন মিস হয়ে যাবে!
মিনিমাম চল্লিশটা পায়ে ৪ মিনিটে প্রণাম সেরে ট্রেনে ওঠা চাট্টিখানি কথা না!!
চাওয়া পাওয়ার কোনো হিসেবে নেই কিন্তু আজও স্টেশনের সেই প্রণামের হিড়িক ছবির মতন স্পষ্ট !
এক গাদা পসিটিভ এনারজি কালেক্ট করে আমরা রওনা হতাম কলেজের দিকে।
আরেক ধরণের প্রণাম শুরু হলো হোস্টেল পৌঁছে । Ragging পিরিয়ড এ সিনিয়র দিদিদের কোমর অবধি ঝুঁকে মাথা নত করে "নমস্তে দিদি" বলতে হতো । যতবার দেখা হবে ততবার ।মাটির থেকে চোখ তোলা চলবে না। না করলে খুব বকাবকি করতো। চাপের প্রণাম।
মনে পড়ে একদিন খেয়ে দেয়ে বাসন ধুচ্ছিলাম হোস্টেলে করিডর এর বেসিনে। আমি আর আমার রুমমেট কুটুন। হঠাৎ পায়ের আওয়াজ। চোখ তুলে দেখা মানা। দুজনে সঙ্গে সঙ্গে বাসন রেখে একসাথে মাথা নিচু করে বললাম "নমস্তে দিদি"!
পাশ দিয়ে হোস্টেলের এর একটা কুকুর ল্যাজ নাড়তে নাড়তে চলে গেলো।......এমনি সম্মান আজ অবধি ওকে কেউ মনে হয় দেয় নি!
আমরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলাম, চোখে চোখে একে অপরকে বললাম "এই ঘটনা যেন কেউ না জানতে পারে"!
ঠাকুর প্রণামের গল্প আর কি বলব ।
প্রণামের ঘটা ডাইরেক্টলি proportional to পরীক্ষার সাবজেক্ট ।
ফিজিক্স কেমিস্ট্রি অঙ্ক --চোখ বুজে মিনিট তিনেক প্রণাম ।
বাংলা ইংলিশ অনেকসময় ডান হাতের তর্জনী বার তিনেক কপালে ছুঁয়েই শেষ ।
ইতিহাস আর ভূগোল সলিড ৫ মিনিট শুধু হাত জুড়েই নয়, পারলে হাঁটু মুড়েও ।
হোস্টেলে গিয়ে (বেনারস এর মতন শহরে) যেন হঠাৎ options বেড়ে গেলো ।
ফিজিক্স পেপার ওয়ান ক্যাম্পাস এর ভেতর বাবা বিশ্বনাথ এর মন্দির গেলেই মোটামুটি উৎরে যাবার স্বভাবনা । মন্দিরের বাইরে কোল্ড কফি ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু !
পেপার টু একটু জটিল, ক্যাম্পাস থেকে কিছুটা দূরে সঙ্কটমোচন এর কাছে না গেলে ঠিক মন মানত না । পুজো দিয়ে বেরিয়েই সামনে কচুরি আর আলুর তরকারি।..যেন অমৃত!
পেপার থ্রি ছিল সাংঘাতিক। উপোষ করে, চান করে ,পরীক্ষার আগের দিন auto চেপে সোজা আসল বিশ্বনাথ মন্দির এর প্রণাম না ঠুকলে পাস্ করার কোনো সিন্ নেই। বাবার মাথায় জল ঢেলে, (eletromagnetism চ্যাপ্টার টা একটু দেখো বাবা ) মন্দিরের বাইরের ছোলে-বাটুরে-যেন স্বর্গলাভ!
যতই ইয়ার্কি করি, এই প্রণামের জোরে অনেক কিছু উৎরে গেছি। .....
এরপর গল্প বিয়ের পর। শশুরবাড়িতে বৌভাতের দিন সকাল এ । শাশুড়ি মায়ের কিছু বান্ধবী এসেছেন বৌমা দেখতে। এমনিতেই বাবা মা ছেড়ে এসে নতুন বাড়ি।..তারপর সকাল থেকে সেজে গুজে নতুন বৌমা হয়ে মুখে হাসি লাগিয়ে বসে থাকা। আমার মতন ঢিপ ঢিপ প্রনামে বিশ্বাসী মেয়েও সেদিন ঠিক প্রণাম করার মুড এ ছিলোনা ।. মায়ের বান্ধবীদের মধ্যে একজন আমার হাতে এগিয়ে দিলেন চন্দ্রানী পার্লস এর বাক্সটা । আমি "ধন্যবাদ" বললাম, হাত জোর করে নমস্কার করলাম, হাসি মুখ, মাথায় ঘোমটা। হটাৎ চোখ তুলে দেখি শাশুড়িমা আমাকে ইশারা করছেন ওনাদের প্রণাম করতে! ওনার নিজের চোখের মনি আমার চোখের সাথে লক করিয়ে সোজা বান্ধবীদের পা অবধি বার দুই তিন নিয়ে গেলেন। ইশারা ক্লিয়ার !!
এখন ভাবলে হাসিও পায়, ঢিপঢিপ করে ওনাদের প্রণাম সারলাম । মায়ের মুখে কি তৃপ্তির হাসি। .....(কোনো চিন্তা নেই উনি রেগুলার আমার ব্লগ পড়েন ;-))
এরপর এলো ছেলেকে প্রণাম শেখাবার পালা।
হল্যান্ড এর বড় হওয়া ছেলে, প্রণাম তো "দেখে " না তার দৈনন্দিন জীবনে। তাকে শেখালাম। কেন শেখালাম সেটা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারবোনা। ছোট্ট ছেলে, হয়তো খুব মজা পেলো তাই শিখলো ।
এয়ারপোর্ট এ নেমে যখন দুই সেট বাবা মা কে প্রণাম করলো চার বছরের ছেলে, আমার কিন্তু দারুন আনন্দ হলো। দাদু ঠাকুমার দাদু দিদার কতটা আনন্দ হোলো তার থেকে আন্দাজ করে নিতে পারি।
বয়স এবং সময়ের সাথে সাথে প্রণাম অনেক কমে গেছে ।গুরুজনেরা অনেক বেশি বন্ধু স্থানীয় হয়ে উঠেছে , প্রণাম এর জায়গায় "big hug " সত্যি আরো বেশি আন্তরিক ।ভালো লাগে ।
.......আমি আজও প্রনামে বিশ্বাসী।
আমাকে কেউ প্রণাম করলে বাধা দিই না।
...অঢেল "positive energy" ঢেলে দি তার মাথায়।....
;-)
pc: metaphysics.com
